“স্মৃতির আল্পনায় মিকশিমিল রুদাঘরা উচ্চ বিদ্যালয়”

 

মােঃ আব্দুল খালেক গাজী

অবসর প্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক,মিকশিমিল রুদাঘরা উচ্চ বিদ্যালয়,ডুমুরিয়া,খুলনা।

 

মিকশিমিল রুদাঘরা উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটা স্কুলের নাম নয়, এটা একটা ইতিহাস, একটা মানুষ গড়ার কারখানা। এ স্কুল জন্ম দিয়েছে বহু ডাক্তার, বহু ইঞ্জিনীয়ার, বহু জাজ, বহু আইনজীবি, বহু শিক্ষক, বহু বড় বড় সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও বহু প্রােথিতযশা রাজনীতিবিদদের। ১২১ বছরের ঐতিহ্যবাহী স্মৃতি নিয়ে স্কুলটি দাড়িয়ে আছে বিশাল গর্ব নিয়ে। আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্থায়ী স্বীকৃতি প্রাপ্ত স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু নলিনী রঞ্জন ঘােষ । নলিনী রঞ্জন ঘােষের বিকল্প নলিনী রঞ্জন ঘােষ ছাড়া আর কাউকে ভাবা যায় না। আমি যখন হাই স্কুলে পড়া শুরু করি তখন স্বনামধন্য শিক্ষক মরহুম মােবারক আলী ফকির, মৃত মানিক লাল সরকার, মৃত নারান বাবু, মরহুম জালাল উদ্দিন প্রমুখ শিক্ষকরা এ স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আমি যখন ৭ম শ্রেণিতে পড়ি তখন মৃত নলিনী রঞ্জন ঘােষ ভারতে চলে যান। এর পরে চলে প্রধান শিক্ষকের পদে বহু রদবদল। স্বল্প কালীন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন মরহুম আব্দুস ছালাম জোয়ার্দার (মধুগ্রাম) , মরহুম মতিয়ার রহমান (চুকনগর), মরহুম আবু জাফর গাজী(চেঁচুড়ী) ও মৃত ডি.এন. নাথ। ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার জীবনে নেমে আসে ধস। পরবর্তীতে স্কুলের হাল ধরেন অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মােঃ তকিম উদ্দিন আহমদ, যিনি সহকারি শিক্ষক হিসেবে আমি যখন ৭ম শ্রেণিতে পড়ি তখন অত্র স্কুলে যােগদান করেন। তার হাতে প্রথম ৮ম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়া শুরু হয়। পরের বছর যখন আমি ৮ম শ্রেণিতে উঠি তখন তার হাতে আমি ও আমার ২ বন্ধু দক্ষিণ মিকশিমিলের মােঃ আব্দুল মুত্তালিব সরদার ও উত্তর মিকশিমিলের মােঃ আনছার উদ্দিন গাজী এই তিন জনে বৃত্তি পাই। পরে যখন স্যার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন স্কুলের ভাবমূর্তি পরিবর্তন হতে শুরু করে। বহু চড়াই উত্রাই পেরিয়ে হাটি হাটি পা পা করে উপজেলার ভিতর আমাদের স্কুলটি Result এর দিক থেকে সর্বোচ্চ স্থান দখল করে নেয়। ইংরেজি ১৯৭৯ সালে আমি শিক্ষক হিসেবে যােগদান করি। স্কুলে ঢুকেই দেখি ছাত্র-ছাত্রীদের ভাল Result এর ব্যাপারে হেড স্যার নিবেদিত প্রাণ। তার অনুপ্রেরণায় উৎসাহিত হয়ে আমরা যারা তার সহকর্মী ছিলাম সবাই বিপুল উৎসাহে কাজ করেছি। ফলও পেয়েছি।হেড স্যারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাকে সাহায্য করেছেন ঐ সময়ের সুশিক্ষিত,দক্ষ ও আদর্শ শিক্ষকবৃন্দ। তারা ছিলেন হেড স্যারের নিকট Obediently obedient. ফুটবল খেলায় জিততে হলে দলের ১১ জন খেলােয়াড়কেই সুদক্ষ খেলােয়াড় হওয়ার দরকার-নইলে সে দল কখনও জয় লাভ করতে পারে না। আমাদের হেড স্যার দ্রুপ নিবেদিত প্রাণ ও সুদক্ষ শিক্ষক পেয়েছিলেন। তাদের ভিতর অনেকেই Retirement এ চলে গেছেন। কেউ কেউ আজ বেঁচে নেই। যারা না ফেরার দেশে চলে গেছেন আল্লাহ তাদের জান্নাত নসীব করুন, আর যারা বেঁচে আছেন তাদের কে ধন্যবাদ ও আল্লাহ তাদের দীর্ঘায়ু দান করুন। আল্লাহর অশেষ রহমতে বহু রত্ম আমাদের স্কুল হতে বেরিয়েছে। উদাহরন স্বরুপ কিছু সংখ্যক কৃতি ছাত্র-ছাত্রী যারা বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন সরকারী মেডিকেল কলেজ ও বিভিন্ন সরকারী কলেজ হতে কৃতিত্বের সাথে পাশ করে বেরিয়েছে তাদের নাম নীচেয় উল্লেখ করলাম। সবার নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয়। স্মৃতিপটে যাদের নাম মাঝে মধ্যে ভেসে উঠে তাদের নাম উল্লেখ করলাম। তাদের মধ্যে ড. আনােয়ার হােসেন জোয়ার্দার, মােঃ শাহীদুল ইসলাম গাজী, প্রমিলা সরকার, ডাঃ আজহারুল ইসলাম মােড়ল, ডাঃ রওশানারা বেগম, ডাঃ বিশ্বাস আখতার হােসেন, বিশ্বাস আফজাল হােসেন(অবসর প্রাপ্ত এ,আই,জি), ডাঃ বিশ্বাস শাহীন হাসান, ডাঃ বিশ্বাস আবুল হােসেন, ইঞ্জীনিয়ার মােঃ কওছার আলী গাজী, ডাঃ বিশ্বাস শাহানাজ (মিনা), ডাঃ বাহারুল ইসলাম জোয়ার্দার, ডাঃ জি, এম মকবুল হােসেন, ড. জি,এম ছালাম আজাদ, ড. আব্দুস ছবুরের  নাম উল্লেখ যােগ্য। স্মৃতি পটে যখন এদের কথা ভেসে ওঠে বা এদের সাথে দেখা হয় তখন গর্বে বুক ফুলে ওঠে। আরও অনেক ছাত্র ছাত্রী দেশে বিদেশে ভালো ভালো অবস্থানে আছে তাদেরকে ধন্যবাদ। কিন্তু স্মৃতিতে না আসায় তাদের নাম লিখতে পারলাম না বলে দুঃখিত।

 

বেশ কয়েক বিঘা জমির মধ্যস্থলে স্কুলটি অবস্থিত। এতদৃপ্রসঙ্গে জমি দাতাদের যার যার নাম আমার জানা আছে তাদের নাম উল্লেখ করলাম । জমি দান করেছেন দত্ত মশাইরা, মরহুম ডাঃ আব্দুল মতলেব গাজী, মৃত হাজারী সাহা, স্কুলটির দক্ষিণ পাশের বাসিন্দা মরহুম ভােলা জোয়াদ্দার ও তার শরীকরা। তাদেরকে ধন্যবাদ ও আল্লাহ তাদের জান্নাত নসীব করুন । 

 

বর্তমানে মিকশিমিল স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমার স্নেহাস্পদ মােঃ আবুল কালাম জোয়ার্দার। ভাল শিক্ষক ও দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে তার প্রশংসা করলে অত্যুক্তি হবে না। অবসর প্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে আমিই বেশিরভাগ সময় স্কুলে যাওয়া আসা করি বলে আমার ধারণা। বর্তমান প্রধান শিক্ষকের সাথে প্রত্যেক ক্লাসে মাঝে মধ্যে | ঘুরতে যাই। দু-একটা ক্লাসও নেই। ছাত্র-ছাত্রীদের ভাল রেজাল্ট করার জন্য অনুপ্রেরণা যােগাই, উৎসাহ দেই। | তাই বর্তমানে স্কুল সম্বন্ধে যতটুক খােজ খবর রাখি আমাদের সময়কার মতাে ভাল রেজাল্ট এর ধারাবাহিকতা বর্তমান শিক্ষকরা ধরে রাখতে পারছে এবং ভবিষ্যতেও পারবে বলে আমার বিশ্বাস। ভাল রেজাল্ট করার ব্যাপারে বর্তমান শিক্ষকদের ভিতর যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা যায় তাতে মনে হয় গৌরবের মালা একসময় তাদের গলায় শােভা পাবে কারণ “Good deeds are never disrewarded.” তবে যে যাই বলুক না কেন বাবু নলিনী রঞ্জন ঘােষের মতাে আমার লিখতে ইচ্ছা করছে প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মোঃ তকিম উদ্দিন সাহেবের বিকল্প মোঃ তকিম উদ্দিন সাহেব ছাড়া আর কারুর কথা ভাবা যায় না।